বেজবাবাকে উৎসর্গ...

দিনটা ছিল ২০১৭ সালের আগস্টের ২৬ তারিখ,
একদিন কলেজ শেষে আমি, তুরাবি হেটে হেটে যাচ্ছিলাম মামার দোকানে চা খেতে নিজেদের ক্লাসের প্যারা থেকে একটু হালকা করতে। তখন মাথায় হঠাৎ করে একটা ভাবনা এলো। বললাম তুরাবিকে যে “আমরা কিন্তু বেজবাবাকে নিয়ে একটা ট্রিবিউট দিতে পারি। তার কাছে এর মাধ্যমে আমাদের কথা পৌঁছাতেও পারি যে আমরা বেজবাবার সাথে আছি। উনি তার অসুস্থতারর সাথে লড়বার সময় যাতে না ভাবেন যে কেউ নেই তার সাথে।” তুরাবি বলল “ঠিক আছে, করা যায়” এরপরেই শুরু হলো ইভেন্ট পরিচালনার কাজ। ঠিক করে নিলাম যে “অর্থহীন” ব্যান্ডের “আমার প্রতিচ্ছবি” গানটি করব। কারন এই গানটির কথা গুলো সম্পুর্নভাবে বেজবাবার প্রতি আমাদের চিন্তাভাবনার সাথে মিলে যায়।



ইভেন্টের আগে আমাদের হাতে সময় ছিল মাত্র ২ দিন। এর মাঝেই আমাদের পুরো ইভেন্টের কাজ সম্পন্ন করতে হয়েছিল। ফেসবুকে ইভেন্ট পেজ খোলবার পর দেখা গেল প্রায় ২০০ জনের মত আমাদের ইভেন্টে আসার জন্য “going” দিয়েছে। আমরা তখন “উদ্যোগ” অর্গানাইজেশন কে বললাম যে আমদের ইভেন্টে ভলান্টিয়ার হিসেবে থাকার জন্য। খুব ভালো লেগেছে যে তারা প্রথম বলাতেই রাজি হয়ে গেল এবং আমাদের ইভেন্টিতে কোনো দাবি ছাড়াই তারা ভলান্টিয়ারিং করল। সাথে টেকনোলজি পার্টনার হিসেবে যুক্ত হতে ইচ্ছুক হলো “Rampage Squad”




ইভেন্টের আগের দিনে আমরা প্রায় ২০-২৫ জন আমার এক বন্ধু “ফাইজান” এর বাসার চিলেকোঠার ঘরে একটি রিহার্সাল এর আয়োজন করলাম। প্রথমদিকে সবার একটু কষ্ট হচ্ছিল মিলাবার। কিন্তু প্রায় ১০ বারের মত প্র‍্যাকটিস করার পর দেখা গেল যে আমরা সবাই একসাথে মিলিয়ে নিয়ে গানটি গেতে পারছি। তখন ফাইনাল রিহার্সাল করলাম এবং সবাই বাসায় গিয়ে পরের দিনের জন্য প্রস্তুতি নিল।

Image may contain: 8 people, people standing and outdoor

পরের দিন সকালবেলা উঠে নিজে আরেকবার গানটি আমার সাউন্ডবক্সে ছেড়ে কাহন দিয়ে প্র‍্যাকটিস করলাম। কারন ইভেন্ট পরিচালনার পাশাপাশি আমি কাহন বাজানোর দায়িত্বে ছিলাম। তারপর কাহনটি নিয়ে রওনা হলাম ফাইজানের বাসার উদ্দেশ্যে। কারন ওইখান থেকেই আমরা আমাদের ইভেন্টের ভেন্যুতে যাওয়ার কথা ছিল সবাই মিলে। আমাদের ইভেন্টের ভেন্যু ছিল জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান (National Botanical Garden). আমরা প্রথমে ফাইজানের বাসা থেকে মিরপুর-১০ নাম্বার হয়ে মিরপুর-২ নাম্বার স্টেডিয়াম এর সামনে সম্পুর্ন টিম একত্রিত হলাম। মোটামুটি ২০ জনের মত একটি টিম। যেখানে নিজেদের পরিচিত কিছু মিউজিসিয়ানস এবং আমাদের পার্টনার “উদ্যোগ” ও “Rampage Squad” এর মেম্বাররা ছিল। আমরা এরপরে বাসে করে ভেন্যুতে পৌছালাম। এরপরে যে যার মত নিজেদের কাজ ভাগাভাগি করে নিল এবং আমরা আমাদের নির্ধারিত স্থানে গিয়ে বসে পড়লাম। জায়গাটি ছিল বোটানিক্যাল গার্ডেনের একটি সবুজ মাঠ। যেখানে আমরা ঠিক করেছিলাম যে আমরা সবাই খোলা সবুজ মাঠের নিচে বসে গান করব। আস্তে আস্তে বাহিরের মিউজিসিয়ানরা আমাদের সাথে যোগ দিতে থাকল। যখন আমি দেখলাম যে পর্যাপ্ত লোকজন এসে পড়েছে তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে প্র‍্যাকটিস শুরু করা যায়।

কিন্তু প্রথমেই খেলাম একটি বড় ধাক্কা। কারন আমি “আমার প্রতিচ্ছবি” গানটি রি-মেক(remake) করেছিলাম ট্রিবিউট দেওয়ার জন্য। কিন্তু দেখা গেল আমার করা রি-মেকের সাথে বাহিরের মিউজিসিয়ানদের মিলিয়ে নিতে অনেক সমস্যা হচ্ছে। অনেকবার রিহার্সাল করেও হচ্ছিল না। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে গানটি অরিজিনাল ট্র‍্যাকের মত করেই গাবো কিন্তু বিট বা তাল অপরিবর্তিত রাখলাম। দেখা গেল এতে প্রথমবারেই সবাই অনেক ভালোভাবে গানটি করতে পারলো। তারপর আবার একটি ফাইনাল রিহার্সাল দিলাম। এবং যখন দেখলাম যে সবাই গানটি সবার সাথে মিলিয়ে নিতে পেড়েছে এবং এখন আমরা ভিডিও করার জন্য ফাইনাল টেক নিতে পারি তখন আমার মাথায় একটি বুদ্ধি এলো। আমি সবাইকে বললাম সবার জন্য ১০ মিনিটের একটি বিরতি নিজেকে রিফ্রেশ করে নেওয়ার জন্য। আর এটা অনেক দরকারও ছিল। কারন টানা ২ ঘন্টা প্র‍্যাকটিস করার কারনে সবার দেহ ও মন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। সবাই এতোটাই ক্লান্ত হয়ে গেসিল যে ১০ মিনিটের ব্রেকে ৩০ মিনিট লাগিয়ে দিল। কিন্তু এতে একটি সুবিধা হয়েছিল। সবার মন চাঙা হয়ে উঠেছিল এবং সবার মুখে একটা শান্তির প্রভাব দেখলাম। হয়তো বা এই শান্তির প্রভাবটি ছিল যে এত বার প্র‍্যাকটিস করার পর পারফেক্ট কম্বিনেশন পাওয়ার আনন্দ। অথবা হতে পারে ২ ঘন্টা ধরে আমার অত্যাচার সহ্য করার পর আধা ঘন্টা মুক্তির আনন্দ 😂

Image may contain: 5 people, people sitting, outdoor and nature

যাই হোক, এরপরে আমরা ফাইনাল টেক দিলাম। মানে ভিডিও শুটিং করার জন্য একসাথে সবাই গানটা করলাম। এবং দেখা গেল খুব ভালোভাবেই সম্পন্ন করলাম। সবাই এতোই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল যে বাড়ি যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করা শুরু করলো।


আমাদের ইভেন্টটি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা ছিল যে আমরা একটি বাক্স রাখবো যেখানে সবাই তাদের ইচ্ছা এবং স্বার্থ অনুযায়ী সাহায্য প্রদান করবে এবং সেটি বন্যায় কবলিত মানুষদের সাহায্যে জন্য “উদ্যোগ” সংস্থাকে প্রদান করা হবে। কিন্তু সেই বাক্সটি আমাদেরকে নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি এবং সবাই এতোই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল যে সেই কথা কারো মাথাতেই ছিল না। তাই আর কোনো সাহায্য করতে পারি নি আমরা “উদ্যোগ” কে। এমনকি কোনা গ্রুপ ছবি তোলবারও সুযোগ পেলো না আমাদের ইভেন্ট ফটোগ্রাফার রা সবার তাড়াহুড়োর জন্য। কিন্তু এটাই স্বাভাবিক। ৩ ঘন্টা গান গাওয়ার পর সবার একটাই চিন্তা, “বাড়ি গিয়ে খেয়েদেয়ে ঘুম দিব।”


এবার আসি আমাদের কিছু ভুল এবং ব্যর্থতার কথায়। আমাদের ফটোগ্রাফার সাহেব ‘মোজাহিদ’ তার ক্যামেরা চার্জ করতে ভুলে গিয়েছিল। যার কারনে মহাসাহেবের ক্যামেরা অর্ধেক ইভেন্টের সময়েই বন্ধ হয়ে যায়। আর অন্যদিকে ‘Rampage Squad’ থেকে করা ভিডিও ফাইলটি হারিয়ে যায়। মানে হয়তো কারো ভুলে ডিলিট হয়ে গিয়েছে অথবা ভিডিও সেভ হয়নি। ভাগ্যিস আমাদের তুরাবি সাহেব তার ২ টি ছোট ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যাকআপ হিসেবে নিয়েছিল এবং ওটা দিয়ে করা ভিডিও ফাইল দিয়েই পরে আমাদের ট্রিবিউট ভিডিও করা হয়েছিল।




ইভেন্টে আমারও কিছু ব্যক্তিগত লোকসান হয়েছে। না! না! টাকার লোকসান নয়। আমার কাহন টা কোনো মহা-ব্যক্তি হাত থেকে ভুলে ফেলে দিয়েছিল এবং হাল্কা ক্ষতি হয়েছে তাতে কাহনের। কিন্তু সেটা ব্যাপার না। কারন দুর্ঘটনা যেকোনো সময়ই ঘটে যেতে পারে।আরেকটি বিষয় যেটি না বললেই নয় সেটি হলো, আমার বন্ধু ‘মুন’ এর গীটারের তার ৩ বার ছিঁড়েছিল। কিন্তু যারা ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেছে তারা সবাই ইভেন্টটি ভালোভাবে উপভোগ করতে পেড়েছে। এটাই সব থেকে বড় শান্তি।

সমস্ত ছবি রয়েছে এই ফেসবুক অ্যালবামেঃ https://www.facebook.com/media/

আনকাট ছবি রয়েছেঃ
  1. https://drive.google.com/open?id=0B4nzcGStDS8qQ2hzT2FnaDVValE
  2. https://drive.google.com/open?id=0B8-cIHigISkvSWM3bGdiYlRvbms
  3. https://drive.google.com/drive/folders/0B4nzcGStDS8qakl1UkFVYXlVU00


ফেসবুক ইভেন্ট পেইজঃ https://goo.gl/8t4pb6
রূপক মিউজিক ক্লাবঃ https://www.facebook.com/groups/rupok.musicclub/
রূপক ম্যাগাজিন কমিউনিটিঃ https://www.facebook.com/groups/rupok.mag


বেজবাবাকে উৎসর্গ... বেজবাবাকে উৎসর্গ... Reviewed by Tazwan Rahman on ৭:৪৯ AM Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই